বোলান গান     

চৈত্র সংক্রান্তির গাজন উপলক্ষে যারা সন্ন্যাসী বা ভক্ত (অনেকে ভক্ত্যাওবলে থাকেন) হয়ে থাকে , তারা গ্রামের পথে-পথে ঘুরে অনেক সময় তর্জার মতো ছড়া বলত এবং নানা পৌরাণিক বিষয় নিয়ে গান রচনা করত ও গাইত , একেই বলা হয় বোলান বা বুলান গান ৷

নামের উৎপত্তি

বঙ্গীয় শব্দকোষ থেকে জান যায় ‘বোলান’ শব্দের অর্থ সম্ভাষণ বা প্রবচন। ‘বোলান’ কথার অর্থ হল বোল আন্ অর্থাৎ সুর আন্। বোল বা ডাক থেকে বোলান নামকরণ। কেউ মনে করেন ‘বুলা’ থেকে বুলান গান। ‘বুলা’ অর্থাৎ ভ্রমণ গ্রাম বা পাড়া ঘুরে এ গান গাওয়া হয় বলে একে ‘বুলান’ বলে।

ইতিহাস

বোলান গানের উদ্ভব কবে সে বিষয়ে পন্ডিত মহলে বিতর্কের অন্ত নেই , তবে পন্ডিতেরা মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে , বোলান গানের উৎপত্তি ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে ৷মতান্তরে বাংলায় তুর্কি আক্রমণের পর থেকে শিবের গাজন উপলক্ষে বোলান গান গাওয়া শুরু হয়। অনেকে মনে করেন, মুর্শিদাবাদের রাঢ় অঞ্চলই হল বোলান গানের আদি জন্মক্ষেত্র। মুর্শিদাবাদ এর পোড়াডাঙ্গা গ্রামের  স্বর্গীয় চারণ কবি পণ্ডিত হরিনারায়ণ  এর  বহু রচনায় আজ থেকে প্রায় দুইশ বছর আগের  বোলান রচনার সন্ধান পাওয়া যায়৷

 

প্রকৃতি

বোলান গানের দল গঠিত হয় গায়ক-বাদকদের সমন্বয়ে। একজন ওস্তাদ (দলপতি/ছড়াদার) দলের নেতৃত্ব দেয়। অল্প বয়সের কিশোর নটিবেশে নর্তকী ও গায়িকার ভূমিকা পালন করে।  এই গানে নারীর প্রবেশ নিষেধ (যদিও বর্তমানে অনেক স্থানে মহিলারা অংশ গ্রহন করছেন ) তাই পুরুষেরাই নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অংশ গ্রহন করে ৷ লোককবিগন বোলান গানের বিষয় নির্বাচিত করে পালা রচনা করে রাখেন এবং গ্রামের দল সেই পালা কে মহড়া বা রিহার্সাল করে অনুষ্ঠানের দিন সন্ধ্যায় আসরে নামেন ৷ বন্দনাগীতির মাধ্যমে বোলান গান শুরু হয় এবং পরে পাঁচালির ঢঙে মূল পালা গীত হয়। গানের পর সংলাপ ও উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে কিছু তত্ত্বকথা ব্যক্ত করা হয় এবং শেষে থাকে লঘু রসের রঙপাঁচালি। এ অংশে নাচ-গানেরও আয়োজন করা হয় দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য।রঙপাঁচালিতে কৌতুক ও হাল্কা রসের বিষয় থাকে, কিন্তু তা কোনোক্রমেই ভাঁড়ামি বা অশ্লীলতার পর্যায়ে পৌঁছায় না। ) এই বোল কেবল পৌরাণিক বোল নয় , সমকালীন বাস্তব জীবনের বোলও বোলানগানে দেখা যায় ৷ সমাজের অন্ত্যজ শ্রেনী ,কৃষক, শ্রমিকও এই গানে অংশ নেয় ৷ সমাজের উঁচু-নীচু স্তরভেদ , অবিবাহিতা নারীর আশাভঙ্গ , প্রেমিক-প্রেমিকা বিচ্ছেদ ,পণপ্রথার শোচনীয় পরিণতি , বেকার সমস্যা , সমকালীন রাজনীতি , অকাল বৈধব্য যন্ত্রনা , শারীরিক অসুস্থ জনিত প্রার্থনা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় গুলি বোলান গানে উঠে আসে ৷ বোলান গানের মূল উদ্দেশ্য হল বহমান মানব জীবনের অসারতা প্রদর্শন ৷এতে লঘু, গুরু উভয় বিষয়েরই স্থান আছে। গুরু বিষয় খণ্ডগীতি, আর লঘু বিষয় রঙপাঁচালি নামে পরিচিত। এখানে একটি দল যখন গায়, অন্য দল ধুয়া দেয়। অভিনয়কারী যে গানটি গায় সেই গানের অন্ত্যমিল যুক্ত ধুয়া গানটি আসরে বসে থাকা অন্যান্য শিল্পীরা সমবেতভাবে গায়। এদেরকে দোহার বলে। 

বাদ্যযন্ত্রও ব্যবহার :-

হারমোনিয়াম , জুরি, ঝাঁঝর, করতাল, ঝুমঝুমি, পাকোয়াজ, তবলা, ফুলেট বাঁশি,  কর্ণেট বাঁশি , কাঁড়া , ঢাক , দু-তিন প্রকারের ঢোল , কাঁসী ইত্যাদি ৷যদিও বর্তমনে যাত্রা গানের মতোই প্রয়োজনীয় আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে ৷ সুরের সঙ্গে বাজনার তাল আসর সব সময় মাতিয়ে রাখে।

 সাজসজ্জা:-

বোলান গানে অংশগ্রহনকারীরা যাত্রার দলের আদলে সেজে গান করেন ।মজার বিষয় হল পুরুষের নারী বা নায়িকা ও অন্যান্য নারী চরিত্রে  এর সাজ সজ্জা ।নারীর বিভিন্ন অলংকার, সাজসজ্জা পরে পুরুষরাই নারী সাজে। বোলানের ভাষায় এদের ‘ছোকরা’ বলে। কারণ অভিনয়ের পরে এরা ধূমপান করলেই সাধারণ মানুষ তখন বুঝতে পারে এরা মেয়ে নয়, ছেলে বা ছোকরা।

 প্রকারভেদ:-

বোলান গানের মূলত ৪টি প্রকার— দাঁড় বোলান, পালা বোলান, সখী বোলান ও শ্মশান বোলান।

বর্তমানে গ্রাম বাংলায় তিন ধরনের বোলানের অস্তিত্ব দেখা যায়৷ এর মধ্যে ছল বোলান বেশ প্রাচীন৷ সাধারণত শিশুরা এই বোলানে অংশ নেয়৷ তবে বর্তমানে সে ভাবে ছল বোলান দেখা যায় না৷ বর্তমানে বহুল প্রচলিত বোলানের মধ্যে একটি যাত্রা বোলান বা ডাক বোলান৷ শিব -পার্বতী সেজে ছোট ছোট পালা লিখে যাত্রার আকারে এই বোলান গান হয়৷কখনও গাওয়া হয় দক্ষযজ্ঞ পালা৷শ্মশান বোলানেরও বহুল প্রচলন দেখা যায় গ্রামাঞ্চলে৷ শিব শ্মশানবাসী৷ তাই তাঁর ভক্তরাও শ্মশান জীবনকে তুলে ধরেন বোলানের মধ্যে দিয়ে৷ রাক্ষস বা কঙ্কালের বেশে চলে নাচ -গান৷ কেউ কেউ শিবও সাজেন৷ মরার খুলি থেকে তলোয়ার নিয়ে চলে উদ্দাম নৃত্য৷ শ্মশান বোলানে দেখানো হয় , শকুন কী ভাবে শ্মশানে শবদেহ ছিঁড়ে খায়৷ কখনও মরা খুলি নিয়ে বন্যপশুদের টানাটানিও প্রদর্শিত হয়৷ তবে অনেক রীতি মেনে বোলান পালন করতে

বোলান গানের প্রধানত দুটো দিক , (১) আচার (২) অনুষ্ঠান , এই আচার-অনুষ্ঠানই হল বোলান গান এবং লোকমানসের চলমান ঐতিহ্য ৷

সময়কাল:-

এই বোলান গান মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান ৷ বোলান গান সাধারণত শিবের গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে বোলান গান চলে। চৈত্র মাসের শেষের পাঁচদিনে(চৈত্রমাসের ২৭শের রাত থেকে ১লা বৈশাখ পর্যন্ত ) কোথাও-কোথাওচারদিনেও হয়  অনুষ্ঠিত হয় তবেপাঁচ দিনের গানের পাঁচ রকমের গানের বৈচিত্রদেখা যায় ৷

    প্রথমদিন ভক্তের দল ক্ষৌরকর্ম করে নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে উত্তরীয় ধারণ করে ৷ এই দিনে প্রধান ভক্ত অনান্য ভক্তদের সাথে নিয়ে গণকের বাড়ি থেকে শিবলিঙ্গ কে মন্দিরে নিয়ে আসেন ৷ আসার সময় ভক্তরা পর-পর শুয়ে থাকেন , তাদের উপর দিয়ে গণক শিবলিঙ্গ কে মন্দিরে নিয়ে আসেন এবং মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন ৷ আর সমস্ত কিছুরই পাশাপাশি চলে বোলান গান , এই দিন সারাদিন উপবাস করে রাত্রে ভক্তের দল ফলাহার করেন ৷

         দ্বিতীয়দিন কে বলা হয় খাজুর ভাঙা ৷ এই দিনে শিব তথা বাণেশ্বর কে স্নান করানো হয় , পরে প্রধান ভক্ত বাণেশ্বর কে সাথে অনান্য ভক্তদের সাথে ছড়ি হাতে নিয়ে খেজুর ভেঙে নিয়ে আসেন ৷ আর এর সব কিছুরই মাঝে বোলান গান চলতে থাকে , এই সব গানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর বন্দনা করা হয় ৷ দ্বিতীয় দিনের শেষেও শেষেও সারাদিন উপবাস করার পর রাত্রে ভক্তরা হবিষান্ন খান ৷

        তৃতীয় দিনের নাম জল সন্ন্যাস বা অন্ধকার স্নান ৷ এই দিনে প্রধান ভক্ত সাথী ভক্তদের নিয়ে রাত্রি দশটা-এগারোটার সময় বাণেশ্বর কে গঙ্গায় স্নান করান ( যেখানে গঙ্গা নেই সেখানে কাছাকাছি কোনো নদী বা বড় জলাশয় স্নান করান ) এবং মানতকারী লোকেরা একই সাথে স্নান করেন ৷ এই দিন শুধু ঢাকের বাদ্য বাজে এবং বাণেশ্বর কে মাঝে রেখে ভক্তের দল নৃত্য করেন ৷ তারপর গভীর রাত্রে ভক্তের দল ফলাহার করেন ৷

     চতুর্থ দিনকে বলা হয় শিবযজ্ঞি (অনেকের মতে শিবযজ্ঞ ) , এই দিন প্রধান ভক্তের সাথে অনান্য ভক্তেরা শিবের সামনে ঘি পুড়িয়ে হোম-যজ্ঞ করেন ৷ পাশাপাশি চলতে থাকে বোলান গান , এই দিনে বোলান গানে ঢাকের সাথে বাঁশি কে বেশি করে ব্যবহার করা হয় ৷

    পঞ্চম দিনকে বলা হয় নীল সন্ন্যাস , এই দিন ভক্তেরা বিকেলের দিকে বাণেশ্বর কে খোলা মাঠের মাঝে রেখে বাণ ফোড়েন ৷ এই বাণ ফোড়ার আবার কয়েক ভাগ আছে ৷ যেমন—পিঠবাণ , জীভ বাণ , রগবাণ(কানের নীচের অংশে ফোড়া হয়), ঠোঁট বাণ ইত্যাদি ৷ এই বাণ মূলত দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকারেরা ফুড়ে দেন ৷ তারপর ভক্ত , মানতকারী লোকেরা সর্বোপরি সমস্ত শ্রেণীর মানুষ বাণফোড়া ভক্তের সাথে নৃত্য করেন ৷ সঙ্গে চলে ঢাক-ঢোল-কাঁড়া-কাঁসর-বাঁশি সহযোগে বোলান গান ৷ এর পর চড়ক গাছ বা সংক্রান্তি চড়ক ও বলা হয় , সমস্ত সন্ন্যাসী বা  ভক্ত রা একটা গাছ পুজো করে তাতে দড়ি বেঁধে ঘুর পাক খান ৷

 

বোলান গান মূলত উত্তর রাঢ়ের লোকসঙ্গীত হলেও নদীয়া,মুর্শিদাবাদ ,পূর্ব বর্ধমান,পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম জেলায় বোলান গান ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ৷ বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোলান গান প্রচলিত ৷ যদিও অঞ্চল ভেদে বোলান গানের আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য আছে ৷ তবে লোকসংস্কৃতির জগতে বোলান গান যে এক প্রাচীন ঐতিহ্য তা অনস্বীকার্য ৷

প্রচলিত এলাকাসমূহ:-

বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিকতার প্রেক্ষাপটে লোক সংস্কৃতিগুলি আবার কিছুটা পৃথক পৃথক। কোথাও কোথাও তা সীমিত ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটা মূলত মুর্শিদাবাদ ও তৎ-সংলগ্ন নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম জেলার কিছু অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়।

বন্দনা :-

এসো গো মা সরস্বতী কি বলিতে জানি

প্রথমে বন্দিবো আমি মায়ের চরণ দুখানি।

এসো গো মা সরস্বতী স্কন্ধে দে মা পা

গলায় দে মা সুরের ধ্বনি কণ্ঠে সুরসাধা।

এসো গো মা সরস্বতী বসো গো মা রথে

বুলান বোলিতে হবে বালকের সাথে।

যে বুলান বোলিবা মা গো তাই বোলিবো আমি

দশের মাঝে ভাঙলে বুলান লজ্জা পাবে তুমি।

বন্দনা করিতে হবে আমার হবে অনেকক্ষণ

একেবারে বন্দে গাবো যত দেবতাগণ।

বন্দনা করিতে আমার যে দেবতা এড়ায়

লক্ষ লক্ষ প্রণাম হই সেই দেবতা পায়।

শুনো শুনো সভাজন করি নিবেদন

প্রথমে বন্দিবো হরগৌরীর চরণ।

নবদ্বীপে বন্দে গাবো নদের বুড়োশিব

চারদিকে বেড়া গঙ্গা মধ্যে নবদ্বীপ।

নবদ্বীপে বন্দে গাবো বেড়া নবদ্বীপ

খড়ে গঙ্গা যুক্তি করে ভাঙ্গলো নবদ্বীপ।

গিরিমাখা বস্ত্রখানি খড়ি উড়ে যায়

এখান থেকে প্রণাম হই সেই দেবতার পায়। 

নবদ্বীপে বন্দে গাবো চৈতন্য গোঁসাই 

 হরি বলে বাহু তুলে নাচে দুটি ভাই।

 উত্তরে বাহিনী গঙ্গা দক্ষিণেতে রসি  

   যাহা গঙ্গা গয়া কাশী গোলোক বারাণসী।

 দরশনে মুক্তি মায়ের পরশিলে হয় 

 বিমানেতে স্বর্গে যেতে যম দাঁড়ায়ে রয়। 

  বৃন্দাবনে বন্দে গাবো মদন গোপাল

রাখাল বেশে চরিয়ে ছিলো নবলক্ষ পাল।

গুপ্তিপাড়ায় বন্দে গাবো গুপ্ত বারাণসী 

বৃন্দাবনচন্দ্রের হাতে আছে সোনার বাঁশি

 

Created with Mozello - the world's easiest to use website builder.

 .